পেলবকাহন

অন্ধকার কি কখনও পেলব হতে পারে? আপাত অদ্ভুত এই প্রশ্নটা আমার আগে মাথায় আসেনি । তোমার এসেছিল কি? আজ এই বেশ শীতল নিশ্ছিদ্র হয়ে আসা রাতে মাথায় এলো । “প্রতিবিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক” শীর্ষক নবারুণের গল্প পড়ছিলাম । শেখানে দেখলাম পেলব অন্ধকারের কথা । পুরোটা পড়িনি । থামিয়ে দিয়েছি ওখানেই । পেলব অন্ধকারে করা স্পর্শের কথা বলছেন লেখক । তুমি দেখেছ কিনা জিজ্ঞাসা করাটা দরকারী মনে হয়েছিল । আমার ঠোঁটদুটো মোটা ও কালো হয়ে আসছে । সেটাও জানানোর ছিল । তুমি নাটক দেখছ । কথা বলতে পারলে না, তাই একথা । কথাটা সকালের কুয়াশাভাঙা রোদে ভাড়ার ঘর দেখতে যাওয়ার সময়ও ভাবিনি । আফসোস হচ্ছে, কেন ভাবলাম না । হয়ত জীবৎকালে ভাবতাম না । পেলব আসলে যে কি আমি জানি না । কেন জানি না । বাংলা সাহিত্যে নেশা করা একটা আপাতমূর্খ ওপরচাল দেখানো মালের পক্ষে না জানাটা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক? কিন্তু পেলব বললেই আসলে যে কি মনে পড়ে বুঝি না । কখনো মনে হয় পেলব আসলে তোমার গাল, কখনও মনে হয় খোসা ছড়ানো ডিম, কখনো মনে হয় গরম সদ্য তৈরী পান্তুয়া, আবার ডুবে মরা কবি অরুনেশের প্রৌঢ়া স্থূলকায়া বেশ্যার স্ট্রেচমার্ক সম্বলিত নিতম্বের কথা । শব ও সন্ন্যাসীতে কেন যে লিখতে গেলেন এসব!! 

আমার দুচোখ কোটরগত হয়ে এসেছে, অস্বস্তির চূড়ান্তে পৌঁছাচ্ছি দিনদিন । রাতে দু-চারটি কথাবার্তা ব্যতীত পড়াশোনাহীন জীবনে গ্যাঁজলা উঠে গেছে । কষ বেয়ে গড়িয়ে আসা বেখেয়ালি থুতুর মত । হঠাৎ করেই কেন জানি না মনে হয় তুমিবইটা যেন ফিরে গেছ লাইব্রেরীতে । আমার নাগালের বাইরে । আমার মেম্বারশিপ নেই । পড়তে চাইছি খুব । নাগাল পাচ্ছি না । আমার স্বচ্ছতায় ঘেন্না এসে গেছে । চোখের নিচে কালি বাড়ছে ক্রমশ ।

ঘর পাল্টাচ্ছি । এখনও জানি না রান্নার ব্যবস্থা কি হবে । তবে আমার মানসের যে স্থিরতা নেই তার টের পাচ্ছ হয়ত । যেটুকু স্থিরতা সেখানে ঘুড়ির সুতোর মত, একটা দিক তুমি অন্য দিকটা বাপ মা । লতপত করছি । অসুস্থ হচ্ছি । ওষুধ খাচ্ছি । হয় তো ফের অনিয়ম শুরু হবে । একমাস আপেল কেনা হবে না । বইমেলায় তোমার পায়ে লেগে থাকা ধুলো দেখে ভাবব সেসব । তারপর হঠাৎই একদিন হরবোলার চিলেকোঠার ঘরে গভীর রাতে জেগে উঠে ডাকব, রাই, তুমি আছ, তাই ঘুড়িটা লতপতিয়ে উড়ে যেতে পারল না সুতো ছিঁড়ে । জানলে মায়ের তখন রাগ হবে, বলবে, এসব কি কথা, এসব কথা যদি ফের মুখে এনেছিস তবে….!! 

প্রাণটা বেশ খানিকটা কমে এসেছে, মাঝে মাঝে অর্থহীন লাগে জীবনটা । ও এন্টার অফসেট আর ভিভিতে ভিসিবিলিটি গ্রাফিক্স, শর্টকাটেই থেমে গিয়েছে সবটা । একটুকরো খোলা সমেত আলুসিদ্ধর মত, সিকিওর, সেদ্ধ হয়ে গিয়েছে তাও । কেবল খোলার বাইরে বেরোলেই ভাবে এই বুঝি গিলে খেল সমাজ । আমি সুন্দর, স্বাস্থবান, উজ্জ্বল নই, তোমার প্রাক্তন প্রেমিকদের মত । আমি শিক্ষিত নই । আমার ওই খোলাটা আছে । আমার বালাপোষ । ওর ভেতরে আমার চেয়ে সুন্দর, আমার চেয়ে রোম্যান্টিক কেউ নেই । জানি, বুঝি হয়ত তোমার বাড়ির লোক আমায় দেখে, আমার শিক্ষা দেখে, মাইনের অঙ্ক দেখে, চেহারা দেখে নিতান্তই তোমার অযোগ্য বলেই ঠাওড়াবে । জিজ্ঞাসা করতে পারে, পেলব মানে জানি কিনা । অমন উত্তর শুনে চা না খাইয়ে তাড়িয়েও দিতে পারে । কিন্তু সত্যি বলছি, আমার অর্থহীনতার সমীকরণ, শর্টকাট, মূর্খতার ঘোরালো ক্ষিদের মুখে নিজেকে গিলে যেতে দেখার মত প্র‍্যাক্টিকালিটি, এক্স্যাম্পল নিয়ে ভাবনার দিকে তাকানোর মত ফুরসত নেই চারপাশের বাতাসটারও ।
শুভ রাত ।

মেঘ…

কাছিমকাহন

কচ্ছপকে উলটে দিয়ে দেখেছো কখনও, প্রথমে হাত পা নাড়ায় খুব । সোজা হতে চেষ্টা করে । তারপর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে । শ্বাস নিতে চেষ্টা করে খুব । বুক কাজ করতে চায় না । শেষে বাধ্য হয়ে মরে যায় । সেই মরে যাওয়াটা সকলে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দ্যাখে । তারপর মরে গ্যাছে বুঝতে পারলেই,ছুরি দিয়ে কেটে নেয় নরমটা । খোলসটা পড়ে থাকে । উলটে । সময় যায় । বর্ষা আসে । জল জমে যায় । তার ভেতর । তারপর আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যায় । হারিয়ে যায় খোলসটা । কোনো চিহ্ন থাকে না তার ।

কি বাজে বকছি…..

এভাবে হয় নাকি…

কচ্ছপের মন আছে নাকি? কচ্ছপ ভাবতে পারে নাকি? কবে কোনকালে একবার জিতেছিল, সেই গপ্প ভাঙিয়ে খায় । যেই উলটে যায়, অমনি ভাবে আমি কি করব? নাকি কিছুই ভাবে না, স্বভাবদোষে উল্টাতে চায় । কিন্তু সবসময় সবজায়গায় নিজেকে উপুড় করে, উজাড় করে রাখাটা দেখেনি কেউ….

সেও খেয়াল করেনি নিজে… কেবল সাগর থেকে মোহনায় এসেছিল ভবিষ্যতের কথা ভেবে…

যখন সব উলটে যায়… তখন ভাবে এসব…

কচ্ছপের ভাবনা গজায়…

কাছিমে থট গজে মরিবার তরে….

অন্ধকাহন

​সেদিন, মাঝসন্ধ্যায় যখন বেশ খানিকটা পূর্ণিমা পূর্ণিমা, তুমি তখন ছাদে এলে  । আমি দিব্যি দেখলুম । আর তারপর কখন যে অজ্ঞান হয়ে গেছি, খেয়াল নেই । তুমিও বুঝতে পারোনি । তারপর থেকেই আমি আর চোখে দেখি না । কেবল তোমার কথা শুনতে পাই । আর সকাল হলে লোককে ডেকে জিজ্ঞাসা করি, আজ কি বার দাদা? কেউ খোরাক করে, বলে, ওই সালা পাগল । 

এভাবেই সারা সপ্তাহ কাটে আমার, শনিবার হলে মনে হয় তুমি যাবে দেখা করতে নন্দন, নইলে গঙ্গাবক্ষে । কি ভাবছ? কি করে জেনেছি? সেদিন রাত্রে বাড়ির সামনেটায় ঘুরে ঘুরে ফোনে কথা বলছিলে না? আমি সব শুনেছি । এই গাছটার নীচে, সারাদিন বসে থাকার পর রাত্রে আমারো মনে পরে কতকিছু, জানো? মনে হয়, যেন কোন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এ আঁধার । মনে হয়, কবেকার শকুন্তলার মতোন তুমি তাকিয়ে আছো জানালা দিয়ে বাইরের দিকে । তোমার প্রেমিক যে, তাকে একবার পেলে বলতুম, এ মেয়েকে চিলেকোঠার ঘরে থাকতে দাও, চুনঝরা দেওয়াল, সে হোক । একটা গ্রামোফোন দাও । পুরানো কালের কলের গান দাও । মাথার মুকুট, না না মুকুট না, টিকলি দাও, আর সিঁদুর দিও । আর শোনো ভাই, কাগজ কলম দিতে ভুলো না । রাজরাণী করে রেখে দিও । আর মাঝে মাঝে যেও তার ঘরে । তবে পারমিশন নিও । না বলে হুট করে ঢুকে যেও না । সন্ধ্যেবেলা একদম না । ভাদ্রমাসের বা আশ্বিনের বেলাদুপুর হলে যেও । ছাদের দরজার ফুটো দিয়ে আগে ছাদে চোখ রেখো ভাই । কি দেখতে পাবে তুমি নিজেও জানো না, তবে যদি আমার মতো খুশ কিসমৎ হও তাহলেই । কোনদিন দেখবে, রোদে চুল মেলেছে, আবার কোনদিন দেখবে, তোমার চেয়েও ভাগ্যবান কিছু পায়রাকে ।  শোনো ভাই, কখনো কিচ্ছু চেও না ওর কাছে । কি পাবে তা তুমি নিজেও জানো না ।

এই এসবই নিজের মনে বিড়বিড় করি আজকাল । আমি । আমি অবিনাশ। আজকাল নিজেকে বড়ো অন্ধ মনে হয় । কতদিন দেখা হয় নি তোমার সাথে । আজ প্রায় একমাস হতে চলল । নিজেকে সত্যিই খুব বুড়ো বুড়ো লাগে । আর মনে হয়, সারাভাবে শাড়ি পড়ে তুমি রান্না বসিয়েছো, বেশ বেলা হয়ে গ্যাছে দেখে রাগ হচ্ছে খুব । বলছ, মানুষটা একটু শান্তি দিল না আমায় । কি মরতে যে হাত দুটো ধরেছিলাম । সবটাই সালা ওর চক্রান্ত । নইলে সরস্বতী পুজোর দিনে এমনিই প্রেম প্রেম জাগে । একটু শরৎ আসা অবধি ঝুলিয়ে রাখা উচিৎ ছিল । দেখতুম ব্যাটা এত সাহিত্য মারায়, আর ভাদ্রমাসে বেলাবেলি কোন বই খোলে । ন্যাকামো দেখে বাঁচি না । আমার আবার নাম দিয়েছে স্রোত । শালা ভন্ড কোথাকার । ফেকু মাল ।

দ্যাখো কান্ডখানা, তোমায় নিয়ে ভাবতে বসি যখন, সিন থেকে সিনান্তরে চলে যায় ভাবনা । সেপিয়া স্ক্রীন, ক্রমশ ভায়োলেট করে আমার স্বাভাবিক দৃশ্যমানতা । ক্যামেরা ছাদের কার্নিস থেকে, গার্ডওয়ালের ওপর দিয়ে জানালার লম্বা শিক আউটফোকাসে রেখে, পাল্লায় পড়া রোদে কন্সেন্ট্রেট করে । অমিতের ক্যামেরা, লাবণ্যকে খোঁজে ফোকাস নষ্ট হওয়ার আগে । হালকা করে যেই দেখা যায় মুখ, জানালার মাঝে অমনি আমি বাকি দিনটুকুর মতন অন্ধ হই । আমি বুঝতে পারি, মাথার শিরা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্তণায় । আমি বেশ খানিকটা বেঁচে আছি আজও ।

প্রতিদিন তোমার ছাদের ঘরে সন্ধ্যা কিভাবে হয় জানি না । তবে একদিন দেখেছিলাম….

তুমি, সারা বিকেল ছাদ জুড়ে রয়েছ । হাতে বই । আর তোমার মেলে রাখা চুল বেয়ে সন্ধ্যা নামছে । তোমায় অগোচরে নিয়ে যাচ্ছে আমার । আমি আর দেখতে পাই না । তোমার ছাদের ঘরে হালকা হলুদ আলো জ্বলা শুরু হয় তখন, শুনতে পাই….